প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ থেকে ব্যর্থ খলনায়ক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুনতাসির চৌধুরী মাহিয়ানঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর বিশ্বস্ত কর্মী ছিলো সিরাজুল আলম খান। বঙ্গবন্ধুর হয়ে সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক’রা সেসময় ছাত্রলীগ এর দেখভাল করতেন। সিরাজুল আলম খান আব্দুর রাজ্জাক এবং আরেফ আহমেদকে নিয়ে ছাত্রলীগের ভিতরেই আলাদা একটি গোপন সেল গঠন করেন। সারাদেশ থেকে ছাত্রলীগের কর্মীদের বাছাই করে সেই বিপ্লবী সেলে সংযুক্ত করা হতো। এর নাম দেন “নিউক্লিয়াস”! মূলত এটি ছিলো ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে একটি উপদল যার মাধ্যমে সিরাজুল আলম খান নেপথ্যে থেকে ছাত্রলীগে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতেন। আর এই বিপ্লবী উপদলকে ব্যবহার করে সিরাজুল আলম খান আওয়ামী রাজনীতির নিয়ামক হয়ে উঠবার স্বপ্ন দেখতেন।

সিরাজুল আলম খান

সেসময়কালে বিশ্বব্যাপী বাম রাজনীতি’র জয়জয়কার যুগের প্রভাবে সিরাজুল আলম খানরা বিপ্লবী চিন্তায় আসক্ত। স্বাধীনতা’র পর এই আসক্তি আরো প্রবল আকার ধারণ করে। তার সাথে যুক্ত হয় শেখ ফজলুল হক মনিদের সাথে রাজনৈতিক গ্রুপিং এর ইকুয়েশন পরিবর্তন। স্বাধীনতার পূর্বে সিরাজুল আলম খানরা ক্ষমতা’র একচ্ছত্র অধিপতি হলেও স্বাধীনতার পর দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। ক্ষমতার হাওয়া বদলে মনি শিবিরে ভীর জমতে থাকে। আব্দুর রাজ্জাকের সাথেও সম্পর্কের অবনতি হয়। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনের। কিন্তু সিরাজুল আলম খানরা চাইতো সশস্ত্র বিপ্লব!! তার এই নীতিকে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ সেসময় গ্রহণ করেন নাই দেশীয় বাস্তবতায়। বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে নিজস্ব চিন্তা ভাবনা ছিলো।

সিরাজুল আলম খান বুঝতে পারেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে তিনি ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছেন। দ্বন্দ্বটা এখানেই। আদর্শ কিছু না। সব ক্ষমতার হিসাবনিকাশ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হল সর্বস্তরের জনগণ ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ। কিন্তু সিরাজুল আলম খান দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় সরকারের নামে এক দলীয় শাসনের দিকে নিয়ে যাবার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। বঙ্গবন্ধু তার এই অগণতান্ত্রিক ও অরাজনৈতিক পন্থায় সায় না দেওয়ায় সরকারকে বেকায়দায় ফেলবার জন্য তিনি ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ শ্লোগান দিয়ে ছাত্রলীগে ভাঙ্গন ধরান।

বঙ্গবন্ধু সে সময় বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর আদর্শের সাথে অমিল, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে কোণঠাসা অবস্থান থেকে বের হয়ে সিরাজুল আলম খানরা গঠন করেন জাসদ। সামরিক কর্মকর্তা মেজর (অব.) এম.এ জলিল কে এই দলের সভাপতি করা হয়। নেপথ্যের গুরু সিরাজুল আলম খান।

বাংলাদেশে বাম আদর্শের গীত গাওয়া হিপোক্রেট শ্রেণী সিরাজুল আলম খানদের আদর্শিক ডিগবাজির শুরু এখানেই। শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলে জাসদ সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। একটি রাজনৈতিক দল হয়ে তারা মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করে যার নাম দেয় “গণবাহিনী”! এই গণবাহিনীর নেতৃত্বে তৎকালীন সময়ে থানায় হামালা, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি পোড়ানো, ব্যাংক লুট ইত্যাদি অপকর্ম সংগঠিত হয়। একটি রাজনৈতিক দল হয়ে সশস্ত্র বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরীর মূল নায়ক জাসদ। এমনকি বিদেশি দূতাবাসে হামলা করে সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা করে জাসদ।

বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করার উদ্দেশ্য নিয়ে জাসদ “গণকন্ঠ” পত্রিকা গঠন করে। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আল মাহমুদ। বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতির গল্প এই “গণকন্ঠ” প্রেসে’ই রচিত।

জাসদের সবচেয়ে বড় আদর্শিক পল্টিবাজি রাজনৈতিক দল হয়ে সামরিক অপশক্তির চক্রান্তে নিজেদের যুক্ত করা। একজন সেনা কর্মকর্তা হয়েও কর্ণেল তাহের জাসদ এর অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেন। কর্ণেল তাহেরের ভাই কে ঢাকা গণবাহিনীর প্রধান সমন্বয়কারী নিয়োগ দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পিছনে দেশের অভ্যন্তরে দুটি শক্তি কাজ করে। একটি সামরিক শক্তি, অপরটি রাজনৈতিক। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পিছনে জাসদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী ও প্রপাগাণ্ডা ছড়িয়ে জনগণ কে দূরে সরিয়ে রাখার কাজটি করে জাসদ। এবং সামরিক ষড়যন্ত্রের ব্যাপারেও অবগত ছিল জাসদের তৎকালীন নেতারা। জাসদ ও সামরিক গোষ্ঠীর সেতুবন্ধনের কাজটি করে কর্ণেল তাহের ও তার ভাই আনোয়ার হোসেন।

সিরাজুল আলম খানরা আদর্শের কথা বলে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর তাদের তথাকথিত শ্রেণীসংগ্রামের কি পরিণতি হয়েছিল?? কর্ণেল তাহেরের স্বপ্নের কি পরিণতি হয়েছিল? যে জিয়াউর রহমান কে পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্ত করেছিলেন কর্ণেল তাহের সেই কর্ণেল তাহেরকেই প্রহসনের বিচারের মধ্য দিয়ে ফাঁসির দঁড়িতে ঝুলায় জিয়া। বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ ছিলো না জাসদের। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর জাসদের ভূমিকায় জিয়া ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করে। অথচ সেই জাসদকে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার মূল নায়ক ছিলো জিয়া। কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলানোর পর প্রতিবাদ জানানোর সুযোগটুকু পায় নাই জাসদ। হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, খুন ও নিখোঁজ হয়। প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ সিরাজুল আলম খান জিয়াউর রহমানের সময়োপযোগী বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের কাছে টিকতে না পেরে বেছে নেন নিঃসঙ্গ জীবনযাপন।

টীকা: পাপ বাপকেও ছাড়ে না। রাজনৈতিক দলের সবসময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। চেয়ারের লিপ্সায় রাজনৈতিক দল হয়েও জাসদ যেদিন সামরিক শক্তির সাথে হাত মিলায় এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে সংযুক্ত হয় সেদিন থেকেই জাসদের পতনের শুরু। আদর্শকে একেবারে ত্যাগ দিয়ে রাজনীতিতে বেশীদিন টিকা যায় না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে নৃশংসভাবে হত্যাকারীদের যে জাসদ রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছিলো সেই জিয়াউর রহমানরাই জাসদের রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেকটি মেরে জাতীয় সমাজতন্ত্রের সমস্ত সম্ভাবনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। ক্ষমতার লোভে সিরাজুল আলম খান যদি আদর্শকে জলাঞ্জলি না দিতো; তাহলে তার ভবিষ্যৎ অন্যরকম হতে পারতো। হয়তো লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যেতে হতো না রহস্য পুরুষ সিরাজুল আলম খানকে।

তথ্য সূত্রঃ জাসদের উত্থান পতন : অস্তির সময়ের রাজনীতি – লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.