নারী দিবসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর লেখনি

নারী দিবসের লেখনি – ফাহরিয়া আমিন ইসরাত
নারী দিবসের লেখনি - ফাহরিয়া আমিন ইসরাত
নারী দিবসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর লেখনি

আমার বউ আমার সব কথা শুনে, একটি সুখের হাসি দিয়ে বললেন আবির ভাই………
তোরা কি মেয়ে হয়েছিস? সে……..? সে জানেনা এমন কিছু নাই। সব ধরনের পিঠা পুলি এমনকি আমার যা কিছু মন চাই সে তা না খাওয়ানোর আগ অবধি তার শান্তি হয় না………।

এমন মেয়ে পেয়েছি আমার ভাগ্য, সে রাতে না খেয়ে বসে থাকে আমি আসব বলে………। কত মেয়ের সাথে ছলকলা করে এসেছি, কিন্তু এরম মেয়ে পাইনাই বলেই তো বিয়ে করিনাই। আমার বউ ঠিক যেন পতিব্রতা যাকে বলে।এই যেমন দেখ, আমার আব্বা পছন্দ করে হিরা নিয়ে আসছে। তোরাও সবুর কর…… আর বিয়ের আগে যা করার কর, তবে পরেও করতে পারবি যদি আমার মত কপাল হয় আর কি! হা হা হ হা………।
উচ্ছাসে গা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসতে লাগল আবীর ভাই।

আমার রাগে ততক্ষণে পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে।
আবীর ভাইয়ের বউ এলিনা, জাহাঙ্গীরনগর থেকে আই আর এ অনার্স মাস্টার্স শেষ করে এওকবার দেয়া এক্সামেই সে সোনালী ব্যাংকে জব পায়। জব পাওয়ার এক বছর পরই তার বিয়ে হয়ে যায়। এদিকে আবার ছয় মাসের মাথায় এলিনকে জব ছাড়তে হয়েছিল কারণ আবির ভাই ভাবতেন এলিনের হয়ত তার কলিকদের সাথে এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার চলছে।
যদিও তিনি এটা এভাবে বুঝাননি, তিনি বুঝাতেন এলিনকে তিনি খুব ফিল করেন তাই বেশিক্ষণ দূরে থাকতে দিতে চান না।
এলিন ভাবী অফিস থেকে  সময়ের একটু দেরি হলেই কলের উপর কল দিয়ে বিরক্ত করতেন। যদি কোন সপ্তাহ তাকে অফিসের মিটিং এর জন্যে সিটির বাইরে যেতে হতো, আবীর ভাই তা দিতে চাইতেন না।উনার যদি সকাল-দুপুর-বিকাল-রাত কোন বেলাতেই খাবার পেতে একটু দেরি হলেই তুলকালাম কান্ড করে বসতেন………। আর ভারবাল এবিউসের কথা বাদই দিলাম। যেখানে এখন সাচ্ছন্দ্যের সাথে আমাদের যুগের বফ গফেরা ভারবাল এবিউজে অভ্যস্ত।

আমি গেলেই এলিন ভাবি এসব বলে কাঁদতেন……।
ভাবি খুব ব্রিলিয়্যান্ট, কিন্তু উনার যখন প্রমোশন হবে বলে নাম এসেছিল তিনি খুশি হয়ে আবিদ ভাইকে জানিয়েছিলেন।

“কি করছিলা বসের সাথে, যে আর কাউকে দেইনি তোমাকেই দিল?” এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন এলিন ভাবীর উজ্জ্বল মুখের উপর। মুখখানা দমে যেতেই, আবীর ভাই বলেন আরে আমি দুষ্টুমি করেছি। (ভাই আমার বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাই সিজিপিএধারী গ্রাজুয়েট আবার)

এলিন ভাবী প্রায় বলেন, সব ছেড়ে দিয়ে ক্যারিয়ারটুকুও জলে দিয়ে যার কাছে সেছি, তাকে যদি মন খুলে দুটো কথা বলা না যায়, তাহলে কার সাথে চল্লিশ বছর থাকতে এলাম ছাব্বিশ বছরের বাবা মা ফেলে? তুমি জানো, আমি চাইলেও সে আমাকে আমার বাসায় যেতে দেয় না……।
উঠতে বসতে আমার শাশুড়ী কথা শুনায়, আমার কি একটু টায়ার্ড লাগেনা বলো? যখন তোমার ভাইকে বলতাম উনি রাতে আসলে পরে, উনি বলত আমি বানিয়ে বলতেছি……। তোমার ভাই অনেক মেয়ের সাথে এখনো কথা বলে, আমি ভেবেছিলাম যা আগে করেছে শেষ…… কিন্তু এখনো?
তুমি জানো, আমি চাচ্ছি না কন্সিভ করতে, কারণ আদৌ আমি টিকব কিনা এখানে বুঝতে পারছিনা। আমি তোমার ভাইকে এখন আর কিছুই বলিনা জানো… কিচ্ছুই না। আপুরে জামাইও বুঝে না যমেও বুঝেনা… বলেই হেসে উঠলেন ভাবী… উনার চোখে পানি নাই, আছে তীব্র অবিশ্বাস আর সন্দেহ নিজের জীবন নিয়ে।

আচ্ছা ভাবী কি আসলেই ভাইকে ভালবেসে এসবকিছু করছেন? নাকি নিতান্তই দায় এড়াতে কথা শুনার ভয়ে এসব করছেন? যাতে একটু  কম শুনতে হয়, আর তাছাড়া শাশুড়ী তো আছেনই একগাদা কথার বস্তা নিয়ে……।।

আমার প্রশ্ন, আবির ভাই কি পুরুষ?
আদৌ কি মানবসমাজের মাঝে পড়েন? শুধু উনি না…………

ক্লাসমেটরা বলে, তোর সাথে ওই স্যারের সাথে ভাল সম্পর্ক, যা তুই পার্সনালি কথা বল স্যার তোকে ফেইল করলো? কেন, উনি যা বলছে তা করছ নাই?
আর সম্ভব হচ্ছে না বলা……
আমরা সভ্য হচ্ছি কেবল পোশাকেই, নোংরা তো মন কবেকার। দামী ব্র্যান্ডের জুতা বা জামা কারো মানসিক স্মার্টনেসকে ক্যারী করে না………।

নারী উন্নতির দিকে এগুচ্ছে, তবে দুনিয়া বড্ড ছোট হয়ে যাচ্ছে। আগে শনতাম … মা বলতেন, “কোন ছেলে কিছু বললে কিছু বলিস না।’’ একটু বড় হতেই শুনি, কিছু বখাটে পাশের বাসার আপুকে কমেন্ট করায় উনি চড় দেন। পরদিন সন্ধ্যায় আপু আর ফেরত আসেন নি।দিন চারেক বাদে উনাকে বাসায় সামনে আধ কাপড়ে ফেলে রেখেছিল কেউ। সেই আপুর আজো বিয়ে হয়নি, কিন্তু আপু ইস্টাব্লিশড…… সুন্দরী।

ভালবেসে বিয়ে করে সামনের ফ্ল্যাটের মেয়েটা আজ দিন পনেরো বাবার বাসায়…। কারণ, তার হাজবেন্ডের নাকি এক তরকারি বেশিদিন ভাল লাগে না। সে বলছে, সে যা ইচ্ছা করবে, তাকে কিছু বলা যাবে না।

স্যালুট আমাদের মেয়েদের যারা অসম্ভব চেষ্টা করে কিছু পশু সমান মানুষের সাথে সংসার করে গেছেন।
নাম দিয়েছেন স্যাক্রিফাইস…… টার্ম দিয়েছেন কম্প্রোমাইজ…… সন্তানের দিকে তাকিয়ে ফিজিক্যাল, ভারবাল, মেন্টার টর্চার সহ্য করে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন সন্তানকে। কিন্তু হায়! মনের অজান্তেই সেথায় গড়ে উঠেছে আরেকজন পারভার্ট…।

আল্লাহ নারীকে এত উপরে স্থান দিয়েছেন যে তোদের সাথে আমাদের সমানাধিকার নিয়ে আলোচনা বসতে হবে না। সেই ক্লাস কাপুরুষদের নাই। আমরা বাচ্চা জন্ম দেই, আমরা দেশ চালাই, আমরা আবিষ্কার করি। তোমাদের একদিনের ফুল সংবর্ধনা দরকার নাই।

তোমরা যখন বলো মেয়ে মানুষ হয়ে কেন এটা করবে। আমি জিজ্ঞেস করি একটি বাচ্চা জন্ম দিয়ে মানুষ করে এক হাতে দেখাও তোমরা। আমি মেয়ে বলে আমি সব পারি।

কোথাও দেখেছেন “সুনারী’’ শব্দটুকুন ব্যবহার করতে?
কিন্তু সব জায়গায় আমরা বলতে শুনি, সুপুরুষ হও…… তার মানে তোমরা প্লিজ তাই হবার চেষ্টা করো…… মানুষ পরে হয়ো।

ফাহরিয়া আমিন ইসরাত
৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিম্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটি।

bay of bengal news / বে অব বেঙ্গল নিউজ