রুবেল যেন মার্কিন সিরিজ প্রিজন ব্রেক এর নায়ক মাইকেল স্কফিল্ড

রুবেল যেন মার্কিন সিরিজ প্রিজন ব্রেক এর নায়ক মাইকেল স্কফিল্ড
রুবেল যেন মার্কিন সিরিজ প্রিজন ব্রেক এর নায়ক মাইকেল স্কফিল্ড
রুবেল যেন মার্কিন সিরিজ প্রিজন ব্রেক এর নায়ক মাইকেল স্কফিল্ড। নায়ক স্কফিল্ড যেভাবে জেল ভেঙ্গে পালিয়েছিল; ধরা পড়া রুবেলও যেন চট্টগ্রাম কারাগার থেকে পালিয়ে সিনেমেটিক কান্ড করল।

চট্টগ্রাম আদালতে হঠাৎ উধাও এক হাজতি। হঠাৎ উধাও হওয়া হাজতি রুবেলের খোঁজে সোমবার (৮ মার্চ) সকাল সাড়ে ১১টা থেকে কারাগারের অভ্যন্তরে থাকা ড্রেনগুলোতে তল্লাশি শুরু করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি একটি দল। দুপুর পর্যন্ত ড্রেন ও সেপটিক ট্যাংকগুলোতে হাজতি রুবেলের খোঁজ না পাওয়ার কারণে যুক্ত হয় আরও একটি সার্চ এণ্ড রেসকিউ টিম। কারাগারের ভেতরে থাকা ড্রেন ও সেপটিক ট্যাংকে কাজ করেছে ৩ সদস্যের একটি ডুবুরি দল। অন্যদিকে রেসকিউ টিমে ছিল ১১ জন সদস্য। সব মিলিয়ে দু’টি দলে ফায়ার সার্ভিসের মোট ১৪ জন সদস্য কাজ করে রুবেলকে খুঁজতে। কিন্তু কোথাও হাজতি রুবেলের সন্ধান পায়নি তারা।


কারণ এর আগে ২০১৮ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় দুইবার আত্নগোপনে ছিলেন,একবার ড্রেনে আরেকবার ছাদে।

কারাগারের দেয়াল টপকে নয়; নির্মাণাধীন চার তলার ভবন থেকেই লাফ দিয়ে পালিয়েছেন খুনের মামলায় কারাবন্দি ফরহাদ হোসেন রুবেল। যদিও গতকাল সোমবার কারা কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটি পলাতক হাজতি ফরহাদ হোসেন রুবেল দেয়াল টপকে পালানোর কথা বলেছিলেন।
চারতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রথমে কারা অভ্যন্তরের ২২ ফুট উচ্চতার দেয়ালটির বাইরে পড়েন তিনি। এরপর সেখান থেকে কারাগারের আরেকটি ১০ ফুট উচ্চতার দেয়াল অনায়াসেই টপকে পালিয়ে নরসিংদী চলে যান।
অবশেষে চার দিনের মাথায় মঙ্গলবার সকালে রায়পুর থানার আদিয়াবাদ শেরপুর কান্দাপাড়া চরাঞ্চল এলাকায় ফুফুর বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ।

গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তাকে চট্টগ্রামে আনা হয়। তাকে প্রথমেই নিয়ে যাওয়া হয় সিএমপির উপ-কমিশনারের (দক্ষিণ) কার্যালয়ে। সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৪টা ২০ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তার ভাঙা পায়ে প্ল্যাস্টার করার পর সন্ধ্যায় কোতোয়ালী থানায় মিডিয়ার সামনে হাজির করার কথা রয়েছে।

কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন জানান, ৬ মার্চ নিয়মিত হাজতি গণনার সময় রুবেল ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে কর্ণফুলী ভবনের ৫ম তলার ১৫ নম্বর কক্ষ থেকে বের হন। সেখান থেকে ভবনের মূল গেট খোলা থাকার সুযোগে বের হয়ে যান। বের হয়েই মাঠে থাকা পানির ট্যাংক থেকে পানি নিয়ে মুখে পানি দেন। এরপর কারাগারের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ফাঁসির মঞ্চের পাশ দিয়ে নির্মাণাধীন চালতলা ভবনের দিকে যান। সেই ভবনটির মূল দরজা বন্ধ থাকায় জানালার গ্রিল ধরে চারতলার ছাদে ওঠেন। সেখান থেকে ৫টা ২৯ মিনিটে ব্যান্ডেল রোডের মা ভবনের পাশ দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় চারতলার ছাদ থেকে লাফ দেন রুবেল। ওই ভবন থেকে কারাগারের প্রধান দেয়ালের দূরত্ব ২২ ফুট। লাফ দেয়ার সময় তিনি ওই ২২ ফুট দূরত্ব নিমিষেই টপকে যান। প্রধান সীমানা দেয়ালের পর কারাগারের আরেকটি প্রাথমিক দেয়াল রয়েছে সেখানের ভেতরে কোণায় একটি নিরাপত্তী চৌকি রয়েছে। ওই দেয়ালের উচ্চতা অন্তত ১০ ফুট এবং তার ওপর কাঁটা তারের বেঁড়াও রয়েছে। ২২ ফুট উচ্চতার মূল দেয়াল থেকে ১০ ফুট উচ্চতার দেয়ালের দূরত্বও অন্তত ১৮ ফুট, তিনি চার তলা থেকে ঠিক ওই স্থানের মাঝ বরাবর পড়েন। এরপর কাঁটাতারের দেয়ালটির ফাঁক গলে টপকে যান। সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রাম ট্রেন স্টেশন থেকে নরসিংদী ফুফুর বাড়ি চলে যান।

সরেজিমনে দেখা যায়, মা ভবনের পাশ দিয়েই কারাগারের প্রাথমিক দেয়ালটি রয়েছে। সেখানে কাঁটাতারের বেঁড়া থাকলেও কিছু কিছু জায়গায় কাঁটাতার নেই। অনায়াসেই যে কেউ চাইলে ১০ ফুট উচ্চতার দেয়ালটি ওই সব ফাঁক দিয়ে টপকাতে পারবেন। সেখানে একটি নিরাপত্তা চৌকি থাকলেও ঘটনার দিন সেখানে কোনও নিরাপত্তা রক্ষী দায়িত্ব পালন করেনি বলে জানা গেছে। ফলে অনায়াসেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন রুবেল। তিনি চট্টগ্রাম থেকে বাসে করে ওই দিনই নরসিংদীর রায়পুর থানার আদিয়াবাদ শেরপুর কান্দাপাড়া চরাঞ্চল এলাকায় ফুফুর বাসায় অবস্থান নেন। মূলত চার তলা থেকে লাফ দেয়ায় তার পা ও কোমরে আঘাত পান। সেখানে তিনি এলাকায় গিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে হেঁটে ফুফুর বাসায় যান। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মনে সন্দেহ হলে আর কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার খবর গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হলে তাদের সন্দেহ হয়। পরবর্তীতে সেই খবর পৌঁছে যায় কোতোয়ালী থানা পুলিশের কাছে। তারাও স্থানীয়ভাবে সোর্স নিয়োগ করে তাকে নজরবন্দি করেন ওই দিনই। পরে নিশ্চিত হয়েই রায়পুরা থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তারে সোমবার দুপুরের দিকে কোতোয়ালী থানার একটি টিম নরসিংদী রওনা দেয়। অবশেষে মঙ্গলবার সকালে তাকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রামে আনে।

শনিবার ভোর থেকে হাজতি রুবেলের সন্ধান না মেলায় দিনভর তল্লাশি করে সন্ধ্যায় জিডির পর রাতে মামলা করেন প্রত্যাহার হওয়া জেলার রফিকুল ইসলাম। জেলারের সাথে প্রত্যাহার করা হয়েছে ডেপুটি জেলার আবু সাদাতকে। কোতোয়ালী থানার মামলা নম্বর ২৩/২১। ধারা-দণ্ডবিধির ২২৪। কর্ণফুলী ভবনের ১৫ নম্বর সেলের দায়িত্বরত কারারক্ষী নাজিম উদ্দিন ও সহকারী কারারক্ষী ইউনুস মিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সহকারী প্রধান কারারক্ষী কামাল হায়দারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে।

সোমবার (৮ মার্চ) সকালে প্রথমে কারা কর্তৃপক্ষের গঠিত কমিটির প্রধান খুলনা বিভাগের ডিআইজি প্রিজন্স মো. ছগির মিয়াসহ তিন সদস্য চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক এ কে এম ফজলুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তারা চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও কথা বলেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আরেকটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

হাজতি উধাওয়ের ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় দায়ের করা মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়, ‘শনিবার (৬ মার্চ) ভোর ৬টা থেকে তালামুক্ত করার পর ফরহাদ হোসেন ওরফে রুবেল নামে এক হাজতিকে পাওয়া যাচ্ছে না। যার হাজতি নম্বর ২৫৪৭/২১। তিনি গত ৯ ফেব্রুয়ারি সদরঘাট থানার একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আসেন। তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানায়। আগের দিন শুক্রবার রাতে সবার সাথে রুবেলও কারাগারের কর্ণফুলী ভবনের ৫ম তলার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে থাকলেও ভোর সাড়ে ৬টার পর থেকে তার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। পরে দায়িত্বরত কারারক্ষী ও হাজতিদের কাছ থেকে জানতে পারেন, হাজতি রুবেল শনিবার ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে যান। পরবর্তীতে পুরো কারাগারে তল্লাশি করেও তার হদিস মেলেনি।’

রুবেল সদরঘাট থানার এসআরবি রেল গেট এলাকায় ৫ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে তুচ্ছ ঘটনায় আবুল কালাম আবু নামের এক ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীকে বুকে ছুরিকাঘাত করেন। পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবুল কালাম হাসপাতালে মারা যান। ৬ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে হত্যার অভিযোগে ডবলমিুরিং থানার মিস্ত্রি পাড়া থেকে ফরহাদ হোসেন রুবেলকে গ্রেপ্তার করে সদরঘাট থানা পুলিশ। ওই মামলায় ৯ ফেব্রুয়ারি আদালতের মাধ্যমে কারাগারে যান রুবেল।

বে অব বেঙ্গল নিউজ / BAY OF BENGAL NEWS