অরাজনৈতিক হেফাজতের উগ্র রাজনীতি

মোনতাছির চৌধুরী মাহিয়ানঃ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আলোচিত-সমালোচিত অরাজনৈতিক সংগঠনের নাম হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতে ইসলাম কতটা সহীহ আকিদা’র উপরে চলছে তার বিচার বাংলাদেশের সচেতন ও শিক্ষিত সমাজ করবে। তবে এই হেফাজতকে নিয়ে আমার কয়েকটি জিজ্ঞাসা আছে।
অরাজনৈতিক হেফাজতের উগ্র রাজনীতি- মোনতাছির চৌধুরী মাহিয়ান

হেফাজত অর্থ খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় নিরাপত্তা দেওয়া অথবা নিরাপদে সংরক্ষণ করা- এমন কিছু একটা। বাংলাদেশ মেজরিটি মুসলমানের দেশ। এই দেশের এমন কোন পাড়া মহল্লা, এলাকা নেই যেখানে একটি মসজিদও নেই। এমনকি যেসব অজপাড়াগাঁ সাক্ষরতার হার একেবারেই নিম্মমূখী সেখানেও মসজিদ ও মক্তব রয়েছে। একেবারে দরিদ্র সীমায় যারা বসবাস করে তারাও সন্তানকে অত্যাবশ্যকীয় ধর্মীয় শিক্ষাটুকু দেয়।  ইসলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিষ্ঠিত ধর্ম- হেফাজতে ইসলাম নামটির যৌক্তিকতা বা  কার কাছ থেকে ইসলাম কে হেফাজত করবে? এটা আমার প্রধান কৌতূহল। বাংলাদেশে কি ইসলাম ধর্ম অনিরাপদ? –যেখানে নব্বই শতাংশ মানুষই মুসলমান।

২০১০ সালে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে হেফাজতের জন্ম হয়। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে প্রতিষ্ঠিত  গণজাগরণ মঞ্চের গুটিকয়েক ব্লগারের ইসলাম বিরোধী বক্তব্যের রেফারেন্স দিয়ে পুরো জাগরণ কে একটি নাস্তিক্যবাদের আড্ডাখানা হিসেবে আখ্যায়িত করে শাপলা চত্বরে যে গণজমায়েত হয়েছিল তার মধ্য দিয়ে বিশাল পরিসরে  আত্মপ্রকাশ করে হেফাজতে ইসলাম।

হেফাজতে ইসলাম নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন দাবি করলেও সেটি রাজনীতির কাছে চুরি হয়ে গেছে। আহমদ শফী সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রেখে হেফাজতকে যে রাজনীতির জাঁতাকল থেকে দূরে রাখার কিছুটা চেষ্টা করেছেন তার ইতি টেনেছে নতুন আমির জুনায়েদ বাবুনগরির হাত ধরে নতুন কমিটি। হেফাজতের যে নতুন কমিটি হয়েছে তার অনেক শীর্ষ নেতা বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারার সাথে সরাসরি জড়িত।

বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার পথচলা বহু বছরের। সেই কওমি ঘরানার একটি সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। গত দশ বছরে কওমি অঙ্গনের কার্যক্রম কে আলাদা রেখে স্বাতন্ত্র্য সংগঠন হিসেবে ইসলামের কল্যাণ ও প্রসারে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি ও কর্মপরিকল্পনা গুলো কি ছিলো?? এই প্রশ্ন রাখলাম।

হেফাজত ইসলাম যতবার দাবি করেছে তারা একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ততবারই হাস্যকর প্রলাপ মনে হয়েছে। ২০১৩ সালে তারা তেরো দফা দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল। সেই লংমার্চ কে কেন্দ্র করে ব্যাপক তান্ডবলীলা চালিয়েছিল হেফাজত। সে সময় হেফাজতের নেতারা দাবি করেছিল কয়েক হাজার মানুষকে মেরে গুম করা হয়েছে। কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রমাণ দিলেন- এমন কোন ঘটনা ঘটে নাই৷
ধীরে ধীরে সেই কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে হেফাজত। এক পর্যায়ে একেবারে নমনীয় পর্যায়েও চলে গিয়েছিল। সরকার থেকে কওমি সনদ আদায় করে নিলো। প্রধানমন্ত্রী কে গণসংবর্ধনা দিলো। নাস্তিকদের পৃষ্ঠপোষক দাবি করা একটি সরকার কে কেন গণসংবর্ধনা দিলো বা তাদের প্রতি এতোটা সহৃদয় কেন হয়তো এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে আগেভাগেই হেফাজতের প্রয়াত আমির আহমদ শফী বলেছিলেন, শেখ হাসিনা একজন পরহেজগার মানুষ। তার ব্যাপারে আমাদের ভুল বুঝানো হয়েছিল। এখন প্রশ্ন- ভুল বুঝানো’র কথা যেহেতু এসেছে, বুঝানোর মানুষ নিশ্চয় আছে। এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল পরামর্শ দেওয়া লোকগুলো কারা?? সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই আহমদ শফী সাহেব চলে গেছেন।

আহমদ শফী’র মৃত্যু নিয়ে অবশ্যই কথা বলা উচিত যেকোন বিবেকবান মানুষের। হোক সে যেকোন দলের। তার মৃত্যুর আগে একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচনা ও প্রশ্নের জবাব দিয়েছিল ভিডিও ক্লিপটি। ভিডিওতে আমরা দেখলাম- একদল লোক অসুস্থ আল্লামা আহমদ শফীর রুম ভাংচুর করছে। আর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা গালি শিখে কাদের কাছে? তাদের তো জানার কথা ইসলামে গালি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একজন শিক্ষকের ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। তবে একজন অসুস্থ, বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া ব্যক্তিকে মুমূর্ষু অবস্থায় এতোটা মানসিক নির্যাতন কি কোন আদর্শিক মানুষ করতে পারে?? ইসলাম কি এর সমর্থন দেয়?? ইসলাম কি কোন মৃতপ্রায় অসুস্থ ব্যক্তির এম্বুলেন্স আটকিয়ে প্রতিবাদের অনুমতি দেয়?? এতোটা উগ্রতা যারা অন্তরে লালন করে তারা ইসলাম কে কতটা ধারণ করে?? যাদের হাত থেকে তাদের শিক্ষাগুরু রেহাই পায় না তাদের রাজনীতি কিংবা সহাবস্থানে একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল রাষ্ট্র কতটা নিরাপদ??

হেফাজতের মুভমেন্ট গুলো যদি  ভালভাবে লক্ষ্য করা হয় তবে দেখা যাবে তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ে জাগ্রত হয় এবং উগ্রতা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র কে জিম্মি করার এক ধরনের আগ্রহ তাদের মধ্যে দেখা যায়। বাংলাদেশ যখন বাঙালি জাতির ইতিহাসের রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন করছে ঠিক সেসময়ে তারা ডাক দিলো ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের। অথচ বাংলাদেশে ভাস্কর্য নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের প্রগতিশীল লোকজন বুঝানোর চেষ্টা করলো- ভাস্কর্য আর মূর্তি এক জিনিস নয়। ভাস্কর্যের দ্বারা ব্যক্তি পূজো হয় না। ইতিহাস সংরক্ষিত হয়। কিন্তু হেফাজত কোনভাবেই মানতে রাজি না। উগ্র হেফাজতিরা সভা-সমাবেশ করেই শুধু ক্ষান্ত হয় নাই। বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্যও তারা ভাংচুর করেছে। অথচ বাংলাদেশের এতো বছরের পুরোনো অন্য কোন ভাস্কর্য নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। বরং তাদের টার্গেটের কেন্দ্রবিন্দু ভাস্কর্য নয়, মুজিববর্ষ ছিলো।

সরকার ও প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীর কঠোর অবস্থানে তারা নিরবতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও আবার ভোরের কাকের মতো চিৎকার শুরু করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’র মাহেন্দ্রক্ষণে। মুজিববর্ষ ও সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার অভিপ্রায়ে বন্ধু ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র প্রধানদের আমন্ত্রণ জানায় বাংলাদেশ সরকার। এটি রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের এবং দুই দেশের সরকারের আন্তরিক সুসম্পর্ক বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ। দল এখানে কোন মূখ্য বিষয় নয়। কোন দল বা দলীয় প্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হয় নাই। আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রীবৃন্দ।

এই সহজ কথাটি একজন শিশু কিংবা পাগল বুঝলেও হেফাজতে ইসলাম বুঝল না। বাংলাদেশে মোদির আগমন ঠেকাতে তারা আন্দোলনের ডাক দিলো। আন্দোলন করতে গিয়ে তাদের আরেকটি আদর্শিক বিচ্যুতি আমরা দেখলাম। ২০১৩ সালে যাদের বিচার চেয়েছে হেফাজত; যাদের কে পারলে দেশ থেকেই বের করে দিতো সেই বাম ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সাথেই স্রোতে মিশে গেল ২০২১ সালে। নারী নেতৃত্ব হারাম বলে ওয়াজ মাহফিলে চিল্লায়ে গলা ফাটানো শিশুবক্তাকে দেখা গেলো নারী পুরুষের মিশ্র মিছিলে। এটাই হেফাজতের চারিত্রিক দ্বিচারিতা। অরাজনৈতিক সংগঠনের কথা বলেও যারা রাজনীতির একটি সুযোগও ছাড়ে না।

মোদির আগমন তারা আটকাতে পারে নাই। কিন্তু বাংলাদেশে নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। হাটহাজারীতে থানা, ডাক বাংলো, ভূমি অফিসে মধ্যযুগীয় কায়দায় তারা আক্রমণ চালিয়েছে। মহাসড়কের মাঝে দেওয়াল তুলে বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের সর্বোচ্চ বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমন কোন সরকারি অফিস, ঐতিহাসিক স্থান বাদ ছিলো না যেখানে হেফাজত তাণ্ডবলীলা চালায় নাই। সেদিন সরকারি-বেসরকারী দপ্তর, বঙ্গবন্ধুর মুর‍্যাল সহ মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি’র ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মৃতি বহনকারী নির্মম আক্রোশের প্রতিফলন ঘটিয়েছিল হেফাজতের কর্মী সমর্থকেরা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শান্তি কমিটির ক্রোধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা যাদের ছিল সেই ঘরানার প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান’ই হামলা ও ধ্বংসলীলার আওতাভুক্ত ছিল। এই আক্রোশময় তান্ডবলীলা দেখে মনে হয়েছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বিজয়ের ঢেঁকুর গিলছে একাত্তরের পরাজিত শকুনেরা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ। সেই কারণে অসাম্প্রদায়িক মানুষেরা তাকে অপছন্দ করে। কিন্তু নৈতিক অবস্থান থেকে হেফাজতের সাথে নরেন্দ্র মোদির বৈসাদৃশ্য কতটুকু?? আমার দৃষ্টিতে হেফাজত ঠিক ততটাই বর্বর যতটা ভারতের নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশে হেফাজত যেভাবে ধর্মীয় বিদ্বেষ কে উস্কানি দেয়, ভারতে বিজেপিও ঠিক তাই। এই কথার সত্যতা প্রমাণ করে- সৌরভ নামের এক সাংবাদিকের কালেমা পড়ে শুনিয়ে হেফাজতি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বেঁচে ফিরতে হয়েছিল সেদিন। এই উগ্র ধর্মান্ধ লোকগুলোর সেদিন সৌরভ নামটি পছন্দ হয় নাই। তুচ্ছতাচ্ছিল্যর সুরে তার দিকে আঁড়চোখে তাকিয়েছিল। অকথ্য মানসিক ও শারিরীক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। কারণ হেফাজতে ইসলামের চোখে কোন মুসলমানের নাম হতে পারে না। এবার ঠান্ডা মাথায় ভাবুন- হেফাজতের সাথে বিজেপি’র পার্থক্য কোথায়??

হেফাজতে ইসলামের সহিংস আন্দোলনের বলি হয়েছিল ১৭ জন মানুষ। ধর্মের নামে হেফাজতের রাজনৈতিক বলি। অথচ এই লাশের গন্ধ বাতাস থেকে বিলীন হওয়ার আগেই হেফাজতে ইসলামের অন্যতম প্রধান নেতা মামুনুল হক গেলেন নারায়ণগঞ্জের একটি রিসোর্টে রিফ্রেশমেন্টের জন্য। পুরোনো সকল প্রশ্ন কিছুক্ষণের জন্য একপাশে রেখে শুধু একটি প্রশ্ন করতে চাই। খেলাফায়ে রাশেদীনের কোন খলিফা যদি মামুনুল হকের স্থানে থাকতেন তবে তিনি কি করতেন?? তিনিও কি মামুনুল হকের মতো কোন রিসোর্টে আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত থাকতেন না কি সেই মৃত লোকগুলোর পরিবারের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। উত্তরটি সকল বিবেকবান মুসলমানের কাছে জানার অপেক্ষায় রইলাম। আমরা তো পড়েছি নবী করিম (স.) এর এমন সাহাবাদের কথা যারা নববিবাহিতা স্ত্রীকে ঘরে রেখে যুদ্ধে যেতে। আর মামুনুল হক লাশের উপর দাঁড়িয়ে তথাকথিত গোপন স্ত্রী নিয়ে গেলেন রিসোর্টে। এটাই কি ইসলামের আদর্শ??

পরবর্তী ঘটনাগুলো আমাদের সকলের জানা।  একটি অপরাধ কে ঢাকতে মামুনুল হক নজিরবিহীন মিথ্যাচারের জন্ম দিয়েছেন। স্ত্রীকে বললেন, জনৈক শহীদুলের স্ত্রী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখলেন মানবিক বিয়ের গল্প। আবার লাইভে এসে বললেন, স্ত্রীকে খুশী করতে সীমিত আকারে মিথ্যা বলা জায়েজ। অথচ ইসলামে মিথ্যা সম্পূর্ণ হারাম। কোরআন শরীফে এই কথা এসেছে। হাদিসে বলা হয়েছে, পাপাচার থেকে দূরে থাকতে চাইলে মিথ্যা বলা ছাড়ো। কতটা নিকৃষ্ট কপটতায় ভরা এই মামুনুল হক লোকটি। যে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে ইসলামের ভুল ব্যাখা দেয়। অথচ এরাই নাকি ইসলামের হেফাজতকারী। 

হেফাজতে ইসলামের একজন শীর্ষস্থানীয়  নেতাও বললেন না, যেনা ইসলামে সম্পূর্ণ অবৈধ। একজনও বললেন না মামুনুল হক ভুল করেছে। ইসলামি শরীয়াহ মোতাবেক মামুনুল হকের বিচার চেয়ে একজনও হুংকার দিলেন না। বরং হেফাজতের রাজনীতিকে হেফাজত করতে বেমালুম ভুলে গেলেন ইসলামের বিধিনিষেধ। নগ্নভাবে একজন যেনাকারীর পক্ষে স্ট্যান্ডবাজি করলেন হেফাজতের ব্যানারে ইসলামের হেফাজতকারী দাবিদার সমাজে আলেম নামে পরিচিতরা। যারা কথায় কথায় হারাম হালালের ফতোয়া শুনান তারাই স্বজনপ্রীতির কাছে স্বাচ্ছন্দ্যে বেচে দিলেন পবিত্র ধর্ম।

২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম সরকারের কাছে তেরোটি লিখিত দাবি জানিয়েছিল। তাদের চতুর্থ দাবিটি ছিল-  ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। অথচ মামুনুলের পক্ষে নোংরা সাফাই গাওয়ার কয়েক রজনী শেষে হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরি বললেন, এটা মামুনুল হকের ব্যক্তিগত বিষয়। হায়রে সেলুকাস। আজীবন অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করতে করতে যাদের শ্মশ্রু সাদা হল এরাই এখন নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত অধিকারের পাঠ পড়াচ্ছে। এই ঘটনা নির্লজ্জতার নজিরবিহীন ইতিহাস হয়ে লেখা থাকবে।

একটি সত্য ঘটনা দিয়ে ইতি টানবো। হযরত উমর (রা.) তখন মসনদে। মুসলমানদের জন্য মদ হারাম। মদ্যপানের শাস্তি ছিল চাবুকের ৮০টি বেত্রাঘাত। হযরত উমর (রা.) একদিন লক্ষ্য করলেন তার নিজ সন্তান মদ্যপান করেছে। তিনি জল্লাদকে তাঁর সন্তানের উপর  নিয়মানুযায়ী বেত্রাঘাতের হুকুম দিলেন। খলিফার সন্তান ভেবে জল্লাদ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে ভেবে উমর (রা.) নিজের হাতেই তুলে নিলেন চাবুক। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন। নির্ধারিত বেত্রাঘাত শেষ হওয়ার পূর্বেই শরীর থেকে প্রাণ বের হয়ে গেল। কারো আকুতি মিনতি সেদিন সুলতানকে ন্যায় বিচার থেকে দমাতে পারে নাই। এটাই ইসলামের ইতিহাস। ন্যায় বিচার ও সততার ইতিহাস। আজকের যুগে ইসলামের তথাকথিত জিম্মাদার বাবুনগরী সাহেবদের কাছে কি আমরা এই ধরনের আচরণ আশা করতে পারি? মনে হয় না! উল্টো নিজের বেলায় তারা ফতোয়া দিতে পারেন, মদ খাওয়া ব্যক্তিগত বিষয় অথবা মাতাল না হলে মদ খাওয়া জায়েজ। যেমনটা মামুনুল হক বলেছেন, সীমিত আকারে মিথ্যা বলা যায়।

ইসলাম শ্বাশত শান্তির ধর্ম। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। কোন ধরনের উগ্রতাকে ইসলাম সমর্থন করে না। যারা মানুষকে ধর্মের দোহাই দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় এরা ইসলামের মুকুট ধারণের যোগ্যতা রাখে না। যারা লাশের সিঁড়ি বেয়ে রিসোর্টে যায় আয়েশ করতে, এদের কাছে ইসলাম নিরাপদ নয়। এরা কখনো ইসলামের হেফাজত করবে না। বরং সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে নিজেদের রাজনীতি কে নিরাপত্তা দিতেই এরা মাথায় টুপি ও পাগড়ি ধারণ করে। এরা ইসলামের হেফাজতকারী নয়, বরং ইসলামকে এসব উগ্র ধর্মব্যবসায়ীদের হাত থেকে হেফাজত করায় প্রতিটি মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। 

লেখকঃ মোনতাছির চৌধুরী মাহিয়ান
৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ
বে অব বেঙ্গল নিউজ / bay of bengal news